জুলাই: চান্দিনার রাজপথে আমার দেখা আন্দোলনের দিনগুলো
জুলাইয়ের প্রথম প্রহর থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রতি আমার গভীর নজর ছিল। একজন সচেতন নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে শুরু থেকেই উপলব্ধি করেছিলাম—এটি কেবল চাকরিতে কোটার প্রশ্ন নয়; এটি ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে, ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি যৌক্তিক আন্দোলন। তাই শুরু থেকেই আমি এই আন্দোলনের প্রতি নৈতিক সমর্থন জানিয়ে আসছিলাম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছিলেন। তখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটি উপলব্ধি তৈরি হচ্ছিল—দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের ভিত নড়বড়ে হয়ে গেছে।
চীন সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মন্তব্য ছাত্রসমাজের ক্ষোভকে আরও উসকে দেয়। দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে।
১৬ জুলাই রংপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে আবু সাঈদ শহীদ হন। তাঁর মৃত্যু আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আবু সাঈদের আত্মত্যাগ যেন সমগ্র জাতিকে জাগিয়ে তোলে। এরপর আন্দোলন দাবানলের মতো সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষও শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে শুরু করেন।
চান্দিনায় আন্দোলনের সূচনা
এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ জুলাই চান্দিনায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সূচনা হয়। এর আগের রাত থেকেই বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং ইসলামী ছাত্র আন্দোলন ও ইসলামী যুব আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধারাবাহিক আলোচনা চলছিল। আলোচনা শেষে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য আন্দোলনের পাশে মাঠে থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
সকাল প্রায় ১০টার দিকে মাধাইয়া মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি কলেজ থেকে আন্দোলনের সূচনা হয়। সেখানে ছাত্রনেতা আশিকুর রহমান, মারুফ, শামিম আহমেদসহ অনেকে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। কিছুক্ষণ পর আমি, যুবনেতা উবাইদুল হক, কামাল হোসেন ফরাজী এবং মাধাইয়া ইউনিয়ন ইসলামী আন্দোলনের সেক্রেটারি হাফেজ মিজানুর রহমান আন্দোলনে যোগ দিই।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চান্দিনা রেদওয়ান আহমেদ কলেজ, চান্দিনা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এবং চান্দিনা আল-আমিন কামিল মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমে আসেন। আন্দোলনের পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে।
শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার জন্য ইসলামী যুব আন্দোলনের উদ্যোগে আমরা সর্বপ্রথম একটি তহবিল গঠন করি এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করি। আমাদের স্বেচ্ছাসেবী দল সারাদিন সাহসিকতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে দায়িত্ব পালন করে।
সেদিন আন্দোলনের মাঠে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কুমিল্লা উত্তর জেলার সভাপতি সাইফুল ইসলাম, ইসলামী যুব আন্দোলনের সভাপতি উবাইদুল হক, মুফতি রাশেদ, মাওলানা কামাল ফরাজী, ছাত্রনেতা হাফেজ শাহজালাল, জোবায়ের খান ফরাজীসহ ছাত্র ও যুব আন্দোলনের বিভিন্ন ইউনিটের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। সবার লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা।
দমন-পীড়ন ও অস্থির সময়
পরবর্তী দিনগুলোতে আন্দোলন দমনে সরকার দেশব্যাপী কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। কারফিউ জারি করা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান জোরদার হয়। একই সঙ্গে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের পরিচয় সংগ্রহের চেষ্টা চলতে থাকে। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। সেই সময়ের ভয়, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার স্মৃতি আজও স্পষ্ট।
১৯ জুলাই সারাদেশে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণ ও দমন-পীড়নের প্রতিবাদে ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশ একটি প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর পীর সাহেব চরমোনাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই নরপিশাচ, তুই আমার ছেলেদের বুকে গুলি করলি কেন?”
তিনি দেশবাসী ও দলের নেতাকর্মীদের শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান এবং চলমান আন্দোলনে নৈতিক ও মানবিক সমর্থন অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর এই বক্তব্য আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগায়।
একই দিনে সভা-সমাবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায়, বাস-ট্রেনসহ বিভিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং কার্যত রাজধানীসহ দেশের অনেক অঞ্চল বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়ে। পুরো দেশজুড়ে এক ধরনের অবরুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যা আন্দোলনের গতিপথকে আরও কঠিন করে তোলে।
এক দফা আন্দোলন ও উত্তেজনা
৩ আগস্ট শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে এক দফা দাবির ঘোষণা আসার পর আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। সারা দেশের মতো চান্দিনাতেও আন্দোলনের জোয়ার সৃষ্টি হয়। দেবিদ্বার উপজেলা ও চান্দিনার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন। আমরাও সেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি।
সেদিন পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। আন্দোলনরত জনতার একটি অংশ সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সরকারি গাড়িতে আগুন দেয়, এতে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
৩ আগস্ট রাত থেকেই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলন প্রতিহত করার ঘোষণা দেন। পরদিন তারা চান্দিনা মহাসড়কের স্টেশন এলাকায় অবস্থান নেন। অপরদিকে চান্দিনার বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্র-জনতা মহাসড়কের পলকী সিনেমা হল এলাকায় সমবেত হতে থাকেন। সেখানে পরিচিত-অপরিচিত অসংখ্য ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনকর্মীকে এক কাতারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কুমিল্লা উত্তর জেলার সভাপতি সাইফুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে আমরাও আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি। সেদিন ঢাকা অভিমুখে যাওয়া বিজিবির সাতটি বাস চান্দিনা এলাকায় আটকে দেওয়া হয় এবং সেগুলো ফিরে যেতে বাধ্য হয়। পুরো এলাকাজুড়ে তখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল, কিন্তু আন্দোলনকারীদের মনোবল ছিল অটুট।
৫ আগস্টের দিন ও বিজয়ের অনুভূতি
৫ আগস্ট “লং মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচির ঘোষণা এলে আমরা ঢাকায় না গিয়ে চান্দিনাতেই অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। মহাসড়ক অবরোধ অব্যাহত রাখি এবং আন্দোলনের কর্মসূচি চালিয়ে যাই। তখনও আমরা নিশ্চিতভাবে জানতাম না যে ঢাকায় কী ঘটছে।
জোহরের আজান হলে আমরা সিদ্ধান্ত নিই—রাজপথেই জামাতে নামাজ আদায় করব। মহাসড়কের ওপরই জামাতের আয়োজন করা হয় এবং আমার ইমামতিতে জোহরের নামাজ আদায় করা হয়। নামাজ শেষে দেশের শান্তি, শহীদদের মাগফিরাত, স্বৈরশাসনের অবসান এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের জন্য আন্তরিক দোয়া ও মুনাজাত করি।
কিছুক্ষণ পর খবর আসে—সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। এরপর জানতে পারি, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। মুহূর্তের মধ্যেই চান্দিনার রাজপথে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ একে অপরকে আলিঙ্গন করছিল, কেউ সিজদায় লুটিয়ে পড়ছিল, কেউ আনন্দাশ্রু ধরে রাখতে পারছিল না।
সেদিন মনে হয়েছিল, দীর্ঘদিনের একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। কিন্তু একই সঙ্গে উপলব্ধি করেছিলাম—কোনো শাসকের পতনই চূড়ান্ত বিজয় নয়। প্রকৃত বিজয় তখনই হবে, যখন ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানুষের মর্যাদার ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
আজও জুলাইয়ের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে রাজপথের স্লোগান, শিক্ষার্থীদের সাহস, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং শহীদদের আত্মত্যাগ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। জুলাই আমাদের শুধু একটি আন্দোলনের স্মৃতি দেয়নি; দিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শিক্ষা। সেই শিক্ষাই আমাদের ভবিষ্যতের পথচলার প্রেরণা হয়ে থাকবে।
লেখক:
মাওলানা মুহাম্মদ মাহদী হাসান
সাংগঠনিক সম্পাদক, ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশ, কুমিল্লা উত্তর জেলা
সাবেক সভাপতি, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ, কুমিল্লা উত্তর জেলা










