জুলাই বিজয়ে কওমির ক্যানভাস
গণঅভ্যুত্থানে আলেম-উলামা ও কওমি শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ, মানবিকতা ও সৃজনশীল ভূমিকা
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। হাজারো মানুষের আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য মানুষের আহত হওয়ার মধ্য দিয়ে সংঘটিত এই গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। জাতি, ধর্ম, শ্রেণি ও পেশার বিভাজন ভুলে সর্বস্তরের মানুষ এ আন্দোলনে অংশ নেন। তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে ছিলেন আলেম-উলামা এবং কওমি মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে কওমি অঙ্গনের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। বিভিন্ন তথ্য ও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ আন্দোলনে মাদরাসার বহু শিক্ষক-শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন কয়েক হাজার আলেম ও শিক্ষার্থী। তাদের আত্মত্যাগ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি
সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনটি পরবর্তী সময়ে নয় দফা এবং শেষ পর্যন্ত এক দফার সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
কওমি আলেম সমাজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থীরা নিজেদের কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবি নিয়ে এ আন্দোলনে যোগ দেননি। তারা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে জুলুম, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) বলেছিলেন, ‘এই যুদ্ধ জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের সংগ্রাম।’ একইভাবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও বহু আলেম-উলামা জুলুম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। কেউ সরাসরি রাজপথে, কেউ মসজিদের মিম্বরে, আবার কেউ লেখনী ও বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনের পক্ষে ভূমিকা রাখেন।
কোটা সংস্কারের পক্ষে বক্তব্য দেওয়া এবং জুমার খুতবায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে খ্যাতিমান আলেম, লেখক ও আলোচক মুফতি আরিফ বিন হাবিব চাকরি হারান। তার মতো আরও অনেক খতিব ও আলেম বক্তব্য, লেখনী এবং জনমত গঠনের কারণে চাপ ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন।
বিভিন্ন ওয়াজ-মাহফিল, খুতবা ও জনসমাবেশে আলেম সমাজ ইসলামের আলোকে ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা এবং জুলুমের বিরোধিতার বিষয়টি তুলে ধরেন। ফলে আন্দোলনের চেতনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে মসজিদের মিম্বর এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।
রাজপথে কওমি শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা
কওমি ধারার অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শুরু থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। দলটির ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করে।
১৮ জুলাই রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নেতা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানোর তীব্র নিন্দা জানান। একই সঙ্গে তিনি অভিভাবকসহ সর্বস্তরের মানুষকে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
পরবর্তী সময়ে হাটহাজারী মাদরাসা, যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসা, চট্টগ্রামের নানুপুর ও পটিয়া মাদরাসাসহ দেশের বহু কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হন। এতে আন্দোলনটি আরও বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি লাভ করে।
৩ আগস্ট সকালে যাত্রাবাড়ীর কাজলা পেট্রলপাম্প এলাকায় ‘সাধারণ আলেম সমাজ’-এর ব্যানারে একটি সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা রিদওয়ান হাসানের উদ্যোগে আয়োজিত ওই সমাবেশে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আলেম, গবেষক ও ইসলামী চিন্তাবিদরা অংশ নেন। বক্তারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জুলুমের প্রতিবাদ এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে আলেম সমাজ ‘গাশত কর্মসূচি’ ঘোষণা করে। ফারসি শব্দ ‘গাশত’-এর অর্থ পদযাত্রা বা পরিভ্রমণ। এই কর্মসূচির মাধ্যমে যাত্রাবাড়ীকেন্দ্রিক আলেম সমাজ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
মানবিক সহায়তায় জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা
রাজধানীর জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা আন্দোলনের সময় মানবিক ভূমিকার জন্য বিশেষভাবে আলোচিত হয়। ১৫ জুলাই ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি চলাকালে নতুনবাজার এলাকায় অবস্থান নেওয়া আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্য মাদরাসাটির দরজা খুলে দেওয়া হয়।
মাদরাসার প্রিন্সিপাল মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়। তারা আন্দোলনকারীদের জন্য পানি, শরবত, স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেন। একই সঙ্গে বিশ্রাম, অজু এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধার জন্য মাদরাসার গেট উন্মুক্ত রাখা হয়।
আন্দোলনের উত্তাল সময়ে এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
আত্মত্যাগের স্মরণীয় অধ্যায়
জুলাই আন্দোলনে কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের কর্মকর্তা মাওলানা শিহাব উদ্দীন নিহত হন। ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর নিজ বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত ও বেদনাবিধুর ঘটনা হয়ে ওঠে।
৫ আগস্ট কারফিউ উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতার সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। কওমি অঙ্গনের বহু আলেম ও শিক্ষার্থীও তখন আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে সক্রিয় উপস্থিতি জানান দেন। গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনের অভিমুখে মানুষের যে জনস্রোত সৃষ্টি হয়েছিল, তা গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে স্মরণীয় দৃশ্য হয়ে থাকবে।
এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কওমি অঙ্গনের ভূমিকা শুধু রাজনৈতিক সংহতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। মানবিক সহায়তা, নৈতিক সমর্থন, জনমত গঠন এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় উপস্থিতির মধ্য দিয়েও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
গ্রাফিতিতে কওমি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল উপস্থিতি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আলোচিত অনুষঙ্গ ছিল গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্র। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের দেয়ালে আঁকা অসংখ্য গ্রাফিতিতে প্রতিবাদ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের প্রত্যয় ফুটে ওঠে।
এসব শিল্পকর্মের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নির্মাণ করেন কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা। আরবি ক্যালিগ্রাফি ও বাংলা টাইপোগ্রাফির সমন্বয়ে তৈরি তাদের শিল্পকর্ম দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসিত হয়।
বিশেষভাবে আলোচিত হয় ‘স্বাধীনতার সূর্যোদয়’ শিরোনামের একটি ক্যালিগ্রাফি। এটি এঁকেছিলেন লালবাগ জামিয়া কুরআনিয়া মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের শিক্ষার্থী মাওলানা উসাইদ মুহাম্মদ। শিল্পকর্মটি আন্দোলনের আশা, প্রতিবাদ এবং নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নের প্রতীকী উপস্থাপনা হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
ইতিহাস সংরক্ষণে আলেমদের উদ্যোগ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রেও কওমি অঙ্গনের উদ্যোগ লক্ষণীয়। আন্দোলনের অল্প সময়ের মধ্যেই আলেম, লেখক ও গবেষক মাওলানা আবদুল্লাহ আল-মাসউদ রচনা করেন ‘২৪-এর গণঅভ্যুত্থান: স্মৃতিচারণ ও ইতিহাস’ গ্রন্থ।
বইটিতে আন্দোলনের সূচনা থেকে পরিণতি, শহিদদের আত্মত্যাগ, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, আলেম সমাজের ভূমিকা এবং সমসাময়িক নানা ঘটনার ধারাবাহিক বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
লেখক নিজেও আন্দোলনের সময় মাঠপর্যায়ে সম্পৃক্ত ছিলেন। ফলে গ্রন্থটিতে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে জুলুম, ন্যায়বিচার এবং গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
আহতদের পাশে মানবিক সহায়তা
আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনেও কওমি অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের খোঁজখবর নেন এবং তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসায় আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়। এই উদ্যোগ আহত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
উপসংহার
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এ আন্দোলনে ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আলেম-উলামা এবং কওমি মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ, মানবিক সহায়তা, নৈতিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক প্রকাশ এবং ইতিহাস সংরক্ষণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই কওমি অঙ্গনের দৃশ্যমান উপস্থিতি ছিল। তাদের ভূমিকা ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
ইতিহাসের প্রতিটি আন্দোলন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা রেখে যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের ন্যায়, মানবিকতা, ঐক্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সেই শিক্ষা আমাদের পথ দেখাক।
লেখক:
মুফতি শেখ মু. নাঈম বিন আ. বারী
বিভাগীয় সম্পাদক (ধর্ম), দৈনিক কুমিল্লার জমিন
উস্তাদুল হাদিস, দারুল আজহার মাদরাসা কমপ্লেক্স, কুমিল্লা।






