৩৬ জুলাইয়ের রণক্ষেত্র যাত্রাবাড়ী: স্মৃতির পাতায় ৫ আগস্টের সেই দিন
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বহু মানুষের আত্মত্যাগ, আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এসেছে বড় পরিবর্তন। শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে এবং মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এ আন্দোলনে অংশগ্রহণের সুযোগকে সৌভাগ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন অনেকে।
কুমিল্লা থেকে ঢাকার পথে যাত্রা
৫ আগস্ট ভোরে কুমিল্লা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন মুফতি শামসুল ইসলাম জিলানী। আমীরে হেফাজতের ঢাকামুখী মহাসমাবেশের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি ঢাকায় আসার সিদ্ধান্ত নেন।
সেদিন গণপরিবহন বন্ধ থাকায় একটি মাইক্রোবাসে যাত্রা শুরু করেন তিনি। কাঁচপুর ব্রিজ এলাকায় বাধার মুখে পড়ার পর বিকল্প পথ ধরে পোস্তগোলা ব্রিজের কাছে পৌঁছান। পরে বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করে যাত্রাবাড়ী মাদরাসার আশপাশে অবস্থান নেন এবং কিছু সময়ের জন্য ‘জামিয়াতুল ইমামিল আজম আল ইসলামিয়া’য় আশ্রয় গ্রহণ করেন।
যাত্রাবাড়ীতে সংঘর্ষ ও ভয়াবহ পরিস্থিতি
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রাবাড়ী এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তিনি জানান, সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষ চলাকালে গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও বিভিন্ন ধরনের আক্রমণের ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করতে গিয়ে অনেক মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়েন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিজয়ের অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার মুহূর্ত
দুপুরের দিকে সেনাপ্রধানের ভাষণের খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজয়ের প্রত্যাশা তৈরি হয়। হাজার হাজার মানুষ যাত্রাবাড়ী থেকে সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন।
তবে একই সময়ে সংঘর্ষ চলতে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। আহত মানুষদের দেখে অনেকে আবার নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ফিরে যান। এ সময় অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে তারা দোয়া ও প্রার্থনা করেন।
ফ্লাইওভারে বিজয়ের মুহূর্ত
দুপুরের পর আবারও সামনের দিকে এগিয়ে যান তারা। ফ্লাইওভারের আশপাশে তখনও সংঘর্ষ চলছিল। ঝুঁকি নিয়ে সেখানে পৌঁছানোর পর হাজারো মানুষের সমাগমে বিজয় মিছিল শুরু হয়।
তিনি জানান, পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানতে পারেন, যাত্রাবাড়ী এলাকায় ওইদিন বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে মাওলানা খুবাইবসহ অনেকেই ছিলেন।
শাহবাগ অভিমুখে জনতার ঢল
পরবর্তীতে চিটাগাং রোড ও অন্যান্য এলাকা থেকে আসা মানুষের সঙ্গে যোগ দিয়ে তারা শাহবাগের দিকে অগ্রসর হন। পুরো শহরজুড়ে তখন বিজয়ের আবহ তৈরি হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া শহীদ, আহত ও ত্যাগ স্বীকারকারীদের অবদান যেন যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়।
এই ইতিহাস থেকে শিক্ষার বিষয়গুলো
মুফতি শামসুল ইসলাম জিলানীর মতে, এই ঘটনাগুলো থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন—
১. বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠন:
দেশে যেন কোনো নাগরিক অন্যায়, বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
২. সহিংসতার বিচার:
দেশের বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
৩. শহীদ পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়ানো:
যারা জীবন দিয়েছেন এবং যারা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের পরিবারকে সহযোগিতা করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন তিনি।
৪. আলেম সমাজের অবদানের স্বীকৃতি:
জাতীয় সংকটের সময় আলেম ও মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়নের আহ্বান জানান।
৫. ভবিষ্যৎ শাসকদের জন্য শিক্ষা:
জনগণের অধিকার ও মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
৬. অর্জিত পরিবর্তন রক্ষা:
দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ ন্যায়, শান্তি ও সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাবে।













