১০৫ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নবাব সলিমুল্লাহর অবিস্মরণীয় অবদান
জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, মুক্তবুদ্ধির বিকাশ এবং জাতীয় জাগরণের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আজ বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬, দেশের ঐতিহ্যবাহী এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯২১ সালের ১ জুলাই যাত্রা শুরু করা বিশ্ববিদ্যালয়টি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রগঠনের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশ গঠিত হলেও ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। এতে পূর্ববঙ্গের মানুষের মধ্যে শিক্ষা, প্রশাসন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে আবারও পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সেই সময় পূর্ববঙ্গে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালোভাবে সামনে আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে সবচেয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় ঢাকার নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহকে। পূর্ববঙ্গে একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি এ দাবির পক্ষে জনমত গঠন এবং ব্রিটিশ সরকারের কাছে দাবি উত্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
১৯১১ সালের ১৯ আগস্ট কার্জন হলে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। বঙ্গভঙ্গ রদের পর তিনি মুসলমানদের শিক্ষা ও অন্যান্য স্বার্থ রক্ষায় তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে আট দফা দাবি উপস্থাপন করেন।
নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক প্রতিনিধিদল
১৯১২ সালের জানুয়ারিতে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে এলে ৩১ জানুয়ারি নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। প্রতিনিধিদলটি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। ওই দিনই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকারি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনায় ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রেও নবাব সলিমুল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য পরবর্তী সময়ে নাথান কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ঢাকায় একটি আবাসিক ও শিক্ষাদানভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম বিলম্বিত হলেও পূর্ববঙ্গের নেতারা দাবি থেকে সরে আসেননি।
এ আন্দোলনকে আইনগত ও প্রশাসনিক পর্যায়ে এগিয়ে নিতে নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিলটি এগিয়ে নেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এর বিধিবিধান প্রণয়ন ও প্রাথমিক সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করেন।
দীর্ঘ আলোচনা ও প্রস্তুতির পর ১৯২০ সালের ১৮ মার্চ ভারতীয় আইনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস হয়। একই বছরের ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেলের অনুমোদনের মাধ্যমে এটি আইনে পরিণত হয়। ‘দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট, ১৯২০’-এর অধীনে ১৯২১ সালের ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল যাত্রা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ—পি জে হার্টগ। তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তি গড়ে ওঠে।
প্রতিষ্ঠাকালে বিশ্ববিদ্যালয়টি কলা, বিজ্ঞান ও আইন—এই তিনটি অনুষদ; ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক, ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী এবং তিনটি আবাসিক হল নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। প্রাথমিক তিনটি আবাসিক হল ছিল সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা হল—বর্তমান শহীদুল্লাহ হল এবং জগন্নাথ হল।
জাতীয় আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের স্বায়ত্তশাসন ও ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং আত্মত্যাগ করেছেন।
১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গণে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ওই রাতে এবং মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী শহীদ হন।
ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, গবেষণা, সাংবাদিকতা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
চিরস্মরণীয় নবাব সলিমুল্লাহ
ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়নে বলা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার আন্দোলনে স্যার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ ছিলেন অন্যতম প্রধান অগ্রদূত। তাঁর দূরদর্শী চিন্তা, নেতৃত্ব, রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং শিক্ষাবান্ধব ভূমিকা পূর্ববঙ্গের মানুষের জন্য উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল বহু ব্যক্তি, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক নেতা, কমিটি ও প্রশাসনিক উদ্যোগের সম্মিলিত ফল। সেই সম্মিলিত প্রচেষ্টার সূচনা ও দাবিকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে নবাব সলিমুল্লাহর অবদান ছিল অনন্য।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় অতিক্রম করেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান, মুক্তচিন্তা, গণতন্ত্র, মানবিক মূল্যবোধ ও জাতীয় চেতনার বাতিঘর হিসেবে দেশের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে নবাব সলিমুল্লাহর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।













